গেম খেলা আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় এবং শেষ পরিনতি

একটা সময় ছিল যখন মাঠে, ঘাটে, উঠানে, বাড়ির আঙিনায়, খালে-বিলে, নদীতে ইত্যাদি জায়গায় খেলাধুলা করে সময় কাটাতো। গ্রাম বাংলার অসংখ্য খেলাধুলার রয়েছে সেগুলো খেলতো। কিন্তু বর্তমানে ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে যুবকসমাজ গেম খেলার প্রতি প্রচণ্ড আসক্ত। আপনি আপনার আশেপাশের মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন তারা বেশিরভাগ গেম খেলার প্রতি প্রচণ্ড আসক্ত হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে আসক্তি গেমগুলো

বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের গেম রয়েছে যেগুলোর প্রতি মানুষ আসক্ত হয়ে পড়েছে। তবে সময়ের সাথে সাথে গেমগুলো পাল্টেছে এবং বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। তবে মানুষ যে সকল গেমগুলোর প্রতি বেশি আসক্ত বর্তমানে তা হচ্ছেঃ পাবজি, ফ্রি ফায়ার, ক্লাস অফ ক্লানস, মোবাইল লিজেন্ড, মাইনক্রাফট, ফোর্ট নাইট ইত্যাদি গেমগুলো আসক্তির তালিকায় সব থেকে এগিয়ে রয়েছে।

আর তাছাড়া এগুলো ছাড়াও অনেক গেম রয়েছে যেগুলো প্রতিও ভিন্ন ভিন্ন মানুষ আসক্ত। যদি দেখেন আপনার আশেপাশে কেউ কোনো গেমের প্রতি আসক্তি ও বা গেম খেলছে তাহলে আপনি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন উল্লেখিত গেমগুলোর মধ্যেই একটি হবে। অর্থাৎ বর্তমানে গেমের প্রতি আসক্তির তালিকায় উক্ত গেমগুলো টপ লিস্টে থাকবে।

গেম খেলায় আসক্তি হওয়ার কারণ

মানুষ পূর্বেও গেম খেলার প্রতি আসক্ত ছিল তবে তার পরিমাণ ছিল খুবই কম। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে মানুষ ঘর বন্দী হয়ে পড়ে, যার ফলে তারা সময় কাটানোর জন্য মাল্টিপ্লেয়ার গেম বা জনপ্রিয় গেম গুলো বেছে নেয়। আর বর্তমানে প্রত্যেকটি গেমের ডেভলপাররা গেমকে এমনভাবে তৈরি করছে যেন মানুষ গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। কারণ বর্তমানে গেম গুলোতে অনেক ধরনের টাস্ক দেওয়া হয় যেগুলো পূরণ করার নেশায় মানুষ নিমজ্জিত থাকে।

আর মাল্টিপ্লেয়ার গেম গুলোতে বন্ধুদের সাথে একত্রে দূর থেকেও গেম খেলা যায়। যেখানে একসাথে কথা বলা যায় এবং গেমের মধ্যে বিভিন্ন জিনিস বিনিময় করা যায় যার ফলে তারা বন্ধুদের সাথে সারাক্ষণ গেম খেলায় নিমজ্জিত থাকে।

অর্থাৎ বলতে গেলে পুর্বেই বলেছি গেম ডেভলপাররা এমন ভাবে গেম তৈরি করছে এবং নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করছে যেন মানুষ তাদের প্রতি আসক্তি থাকে এবং সবসময় তাদের গেমটি খেলে।

আর তাছাড়া গেমের প্রতি আসক্তি হওয়ার আরও কারণের মধ্যে একটি কারণ হচ্ছে অল্প বয়সে মোবাইল ব্যবহার করা এবং অভিভাবকদের ঘাটতি। বর্তমানে অভিভাবকরা অল্প বয়সে বাচ্চাদের হাতে মোবাইল দিয়ে দেয় যার ফলে তারা গেম খেলা প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে।

আবার পিতা-মাতার ভুল পদক্ষেপের কারণেও সারাদিন পড়ালেখা বাদ দিয়ে বাচ্চারা গেম খেলে তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে।

গেম খেলায় আসক্তির ফলে মৃত্যু – কারন

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন গেম খেলায় আসক্তির ফলে আবার কিভাবে মৃত্যু হতে পারে। হ্যা ঠিক শুনেছেন গেম খেলায় আসক্তির ফলে বিভিন্ন কারণে মৃত্যুর ঘটনা দেখা দিচ্ছে।

যেমন এইতো কিছুদিন আগে একটা খবরে আসছে – মোবাইলে ‘ফ্রি ফায়ার গেম’ খেলার জন্য এমবি কেনার টাকা না পেয়ে মায়ের সঙ্গে অভিমান করে মামুন (১৪) নামের এক কিশোর আত্মহত্যা করেছে। আবার এমনও দেখা গেছে গেম খেলা নিয়ে ঝগড়ার মাধ্যমে দুই বন্ধুর মধ্যে খুনাখুনি।

অনেক সময় দেখবেন বাচ্চারা যখন গেম খেলার মধ্যে থাকে তখন তাদের ডাক দিলে বা কোন কাজ করতে বললে তারা হিংস্র প্রানীর মতো আচরন করে। সে মা-বাবা, ভাই-বোন যেই হোক না কেন। তার যেনো আগে গেমটা খেলতেই হবে।

গেম আসক্তির ফলে কি কি ক্ষতি হচ্ছে

গেম খেলায় আসক্তির ফলে মানুষের মাঝে কি কি ক্ষতি হচ্ছে যদি বলা হয় তাহলেই সর্বপ্রথম আসবে মেধা বিকাশে বাধাগ্রস্থ। কারণ সারাদিন গেম খেলার ফলে তারা আশেপাশে কোন দিকেই লক্ষ্য করে না এবং কোন কিছু শিখা বা করতে চায়না, যার ফলে তাদের মেধা বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়।

সারাদিন গেম খেলার ফলে এবং রাতে অনেকটা গেম খেলার ফলে অল্প বয়সে চোখের সমস্যা দেখা দেয় যেমনঃ চোখে কম দেখা, চোখ থেকে পানি পড়া, ঝাপসা ঝাপসা দেখা। সারাদিন গেম খেলার ফলে স্বাস্থ্যের দিকে কোন মনোযোগ থাকে না যার ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে।

একটা সময় মানুষ বাইরে যেয়ে বিভিন্ন খেলা খেলত, কিন্তু মোবাইল গেম গুলো প্রতি আসক্তি হওয়ার পর থেকে তারা সবসময় গেমের মধ্যে মজ্জিত থাকে।

এতে করে এখন আর তারা বাইরে খেলতে যায় না। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে মাঝেমধ্যে একটু আকটু গেম খেলা অন্য বিষয় কিন্তু গেমের প্রতি প্রচন্ড পরিমাণ আসক্তি মানুষকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

গেম খেলার আসক্তি থেকে মুক্তির উপায়

অনেক তো কথা বললাম গেম খেলার আসক্তির কারণ এবং ক্ষতির কারণ গুলো নিয়ে। প্রযুক্তি যেমন আমাদের অনেক দিক দিয়ে উন্নতি সাধন করছে, তেমনি আবার নানা প্রকার সমস্যার সৃষ্টি করছে। তবে প্রত্যেকটি জিনিসের ভালো ও খারাপ উভয় দিক থাকে।

যার মধ্যে একটি হচ্ছে মোবাইল গেমের প্রতি আসক্তি। তারা সব সময় ঘরে বসে গেম খেলে, বাইরে গেলেও গেম খেলে, পড়াশোনা করতে চায় না, কাজে মনোযোগ দিতে চায় না অর্থাৎ সারাক্ষণ গেম খেলায় আসক্ত হয়ে থাকে। গেম খেলার আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে নিচে তুলে ধরা হলোঃ

ছোট বাচ্চাদের হাতে মোবাইল ফোন দিবেন না কিংবা মোবাইল ফোন দেখিয়ে তাদের বিভিন্ন কাজে অভ্যস্ত করবেন না, এতে করে পরবর্তীতে সে মোবাইল ছাড়া কোন কাজ করতে চাইবে না। বাচ্চাদের কাছ থেকে যত সম্ভব মোবাইল ফোন ধরে রাখুন।

অনেক মানুষ রয়েছে যারা গেম খেলে খেলে খাওয়ার অভ্যাস করে। এতে করে পরবর্তীতে সেই গেম ছাড়া খেতে চায় না। তাই এ সকল বদভ্যাস দূরে রাখুন।

তাদেরকে মোবাইল বা কম্পিউটারের ভালো দিকগুলো সম্পর্কে তুলে ধরতে হবে। যেমন কম্পিউটারে বিভিন্ন রকমের কাজ রয়েছে যেগুলো সেগুলো সে পরবর্তীতে অনেক কাজ করতে পারবে। এবং কম্পিউটারে অনেক কিছু শিখে বর্তমানে মানুষ লাখ লাখ টাকা আয় করছে। তাদেরকে সেই সকল কাজে অনুপ্রাণিত করা এবং গেম খেলা থেকে মনোযোগ ছাড়ানো।

তাছাড়া বাচ্চাদের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রাখলে তারা গেম খেলার সুযোগ পাবে না। আপনি যদি তার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেন তাহলে তেমন একটা লাভ হবে না কারণ এতে সে আরো বেশি হিংস্র হয়ে উঠবে। তার চেয়ে বরং তাকে ছোটখাটো বিভিন্ন কাজ দিতে পারেন এবং বাইরে খেলতে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে পারেন।

আজকাল অনেক পরিবার কাজের কারণে ব্যস্ত থাকে যার ফলে বাচ্চাদের সময় দেওয়া হয় না। এতে করে বাচ্চাদের একাকীত্ব মনে হয় এবং তারা সঙ্গী হিসেবে গেম কে বেছে নেয়। তাই সব সময় তাদের কেউ সময় দিন এবং কি প্রয়োজন তাদের সেই দিকে লক্ষ্য রাখুন, এবং তাদের খবরা-খবর সম্পর্কে সকল কিছু জানার চেষ্টা করুন। যেন সে কোন খারাপ দিকে ধাবিত না হয়।

যদি আপনি নিজে একজন গেম আসক্ত হয়ে থাকেন তাহলে উপরের সবগুলো নিয়ম মানার পাশাপাশি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। কারণ একবার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে সবসময় বই পড়তে আপনার ভালো লাগবে এবং নতুন নতুন বই পড়ার একটা আগ্রহ জন্ম নেবে।

যার ফলে গেম খেলার ইচ্ছেটা একটু হলেও কমে যাবে। আর তাছাড়া সব সময় গেম না খেললে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন মুভি বা নাটক দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন, যার ফলে একটু হলেও গেম খেলার আসক্তি হয়তো কমবে।

কিভাবে বুঝবেন আপনি গেম খেলার প্রতি আসক্ত

অনেক মানুষ টুকটাক সময় কিংবা মাঝেমধ্যে কিছু সময় পার করার জন্যও গেম খেলে থাকে। তবে গেম খেললেই তাকে নেতিবাচক হিসেবে নেওয়া যাবে না। যদি সেটি আসক্তির পর্যায়ে চলে যায় তখন এটি একটি খারাপ দিক হয়ে ওঠে। যেমন কিছু কারণ দেখে আপনি বুঝতে মানুষটি গেম খেলার প্রতি আসক্ত

  • দিনের বেশিরভাগ সময় গেমের পেছনে ব্যয় করা কিংবা গেম সম্পর্কিত ভিডিও দেখা।
  • একাকী রুমের মধ্যে বসে বসে বেশি বেশি গেম খেলা।
  • গেমের কারণে পড়ালেখায় মনোযোগ না বসা।
  • না ঘুমিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত গেম খেলা।
  • খাওয়ার সময় গ্রামে ঢুকে বসে থাকা কিংবা গেম খেলার সময় খাওয়া।
  • কারো সাথে মিশতে মনে চাইবে না বরং সারাক্ষণ মনে হবে গেম খেলা শ্রেয়।
Share your love
Salim Sikder
Salim Sikder

বিডিপপুলার তরুন প্রজন্মের বিশ্বস্ত একটি নাম। বিডিপপুলারে আমরা চেষ্টা করি যেনো ভালো কিছু আপনি পান। বিডিপপুলারের সাথেই থাকুন।

Articles: 8