ডাটা সবজি কি এবং ডাটা চাষ করার পদ্ধতি

ডাটা সবজি আমাদের সকলেরই সবচেয়ে প্রিয় একটি গ্রীষ্মকালীন সবজি। আমরা সকলেই কমবেশি ডাটা সবজি ভালোবাসি কারণ, যেকোনো তরকারির সাথে এই সবজিটি খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়। তাছাড়া ডাটা সবজিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যের পুষ্টি গুণাগুণ একসাথে পাইয়ে দেয়।

ডাটা শাক এর বৈজ্ঞানিক নাম

ডাটা শাকের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Amaranthus spp (আমরান্থাস এসপিপি)। ইংরেজিতে ডাটা শাককে বলা হয় Amaranth (আমরান্থ)।

ডাটা সবজি এবং ডাটা শাকের পুষ্টিগুণ

মাছের সাথে ডাটা সবজির তরকারি বানিয়ে খেতে পারেন। ডাটার পাতা দিয়ে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর শাক খেতে পারেন। ডাটা সবজি এবং শাকের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন রয়েছে। যেমনঃ ভিটামিন এ, বি, সি, ডি। তাছাড়া ডাটার মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম, লৌহ এবং খনিজ লবণ।

যদি বলি ডাটা তো অনেক বড় এবং লম্বা হয়। তাহলে প্রশ্নটা হলো ডাটার কোন দিকটায় সবচেয়ে বেশি পুষ্টি থাকে? উপরে না নিচে।

আসলে ডাটার কান্ডের চেয়ে পাতায় সবচেয়ে বেশি পুষ্টি থাকে। পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় খুব কম সবজিতে এত পরিমাণে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ লবণ পদার্থ বিদ্যমান থাকে।

ডাটা চাষ করে সফল

ডাটা চাষ করে আপনি এক বিঘা জমিতে লক্ষাধিক টাকা আয় করতে পারেন। এবং সবজি বিক্রি করতে করতে একসময় আপনি দক্ষ ও সফল সবজি চাষী হয়ে যাবেন। অনেকেই প্রায় ১০ শতাংশ জমিতে ডাটা আবাদ করে এলাকায় অনেক প্রশংসা কামিয়েছে।

একটি ডাটা লম্বায় প্রায় সাত ফুট আর প্রতিটি ডাটার ওজন ২০ থেকে ২৫ কেজি হয়ে থাকে। এতক্ষণ যার কথা বললাম তিনি হলেন যশোর জেলার গাজী লুতফর রহমান।

তিনি অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে ৩০ বছর পূর্বে শুরু করেন সবজির বীজের ব্যবসা। যশোর জেলা থেকে বীজ কিনে এনে বিক্রি করতেন বিভিন্ন হাটে। এক সময় তিনি চিন্তা করতে থাকেন যে, বীজ বিক্রি করে যা আয় হয় তাদের সংসার ঠিক মত চলে না।

তাই ২০ বছর আগে বাজারের পাশের ছোট একটি ভিটায় শুরু করেন ছোট পরিসরে সবজির চাষ। বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ এবং বীজের জাত এর বিভিন্ন ফলন দেখার ইচ্ছা নিয়ে তিনি একসময় পেশাদার সবজি আবাদকারী হয়ে যান।

ডাটা বিক্রির হিসাব মিলিয়ে নিন

বছরের বৈশাখ মাসে সবজির বীজ কেনেন ৫০ গ্রাম যার দাম মাত্র ১৮ টাকা। বীজের জাত হলো কাটোয়া জাতের দেশি ডাটার বীজ। বীজ বপন করার পর ৩০ দিন পরে ডাটা সবজি বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। এবং প্রথম অবস্থায় প্রতি কেজি ডাটা ১০ টাকা দরে বিক্রি শুরু করা যায়।

যার একেকটি ওজন ২ থেকে ৩ কেজি হয়ে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে ডাটা লম্বা ও বড় হতে থাকে। প্রতিটি ডাটা লম্বায় প্রায় ৭ ফুটের মত হয় যার ওজন ২০ থেকে ২৫ কেজির মতো। আর তখন আপনি প্রতিটি ডাটা বিক্রি করতে পারবেন ৭০ থেকে ৮০ টাকায়।

কিভাবে ডাটা চাষ করবেন

আপনার বাড়ির আঙ্গিনায় অথবা জমিতে ডাটা চাষ করতে পারেন। তবে আপনি কোথায় চাষ করবেন সেটা নির্ভর করছে চাষের উদ্দেশ্যর উপর ভিত্তি করে। যদি নিজে খাওয়ার জন্য করেন তাহলে বাড়ির আঙ্গিনা ঠিক আছে। আর যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে ডাটা চাষ করতে চান তাহলে অবশ্যই জমিতে চাষ করতে হবে।

ডাটা চাষের সময়কাল

ডাটা সবজি বপনের সময় হল মার্চ থেকে এপ্রিল ও সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর।

ডাটার বিভিন্ন জাতের নাম

ডাটার বিভিন্ন জাত রয়েছে। যেমনঃ বারি ডাটা ১(লাবনী) এবং বারি ডাটা ২, বাঁশপাতা, আখি, সুফলা-১, কে এস ০১।

কি পরিমান বীজ লাগবে

বিঘা প্রতি ১৯৮ থেকে ৩৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। অথবা শতাংশ হিসাব করলে প্রতি শতাংশে ৬ থেকে ১০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন।

কিভাবে জমি তৈরি করবেন

প্রতি সোয়া দুই হাত প্রশস্ত এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ লম্বা করে বেড তৈরি করতে হবে। প্রতি দুই বেডের মাঝে ১ ফুট নালা রাখতে হবে যেন পানি চলাচল ঠিকমত করতে পারে।

কিভাবে বীজ বপন করবেন

বীজ সরাসরি ছিটিয়ে অথবা লাইন করে বপন করা যায়। যদি আপনি লাইন করে বীজ বপন করতে চান তাহলে বেডের উভয় পাশে ১০ সেন্টিমিটার বাদ রেখে লম্বালম্বি ২০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে লাইন করে বীজ বপন করতে পারবেন।

বীজ বপনের পর কাঠি অথবা হাত দিয়ে বৃষ্টি ডেকে দিতে হবে। এবং বীজ বপনের সময় সমপরিমাণ চাই অথবা বালি মিশে বপন করতে পারলে আপনার বপন উর্বর হবে। আপনার জমিতে যদি পানি না থাকে তাহলে হালকা সেচ দিয়ে দিতে হবে।

সার দেওয়ার পদ্ধতি

কি সার দেবেনকতটুকু দেবেন
পচা গোবর/কম্পোস্ট৪০কেজি
ইউরিয়া২৬৪গ্রাম
টিএসপি৮০০গ্রাম
এমওপি৬০০গ্রাম

ডাটা কখন সংগ্রহ করবেন

ডাটা সবজির ভালো স্বাদ পাওয়ার জন্য পাতা নরম অবস্থায় শাক সংগ্রহ করতে পারলে ভালো স্বাদ পাওয়া যায়। যদি আপনি ডাটা শাকের কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকেন তাহলে পাঁচ থেকে সাত দিন পর শাক সংগ্রহ করতে হবে। প্রতি বিঘা জমিতে ৩০ মণের উপর ডাটা ফলন হয়ে থাকে।

ডাটা শাক এর উপকারিতা

  • ডাটা শাকের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং ফলিক এসিড যা ত্বকের জন্য খুবই উপকারী।
  • ডাটা মধ্যে থাকা “ভিটামিন- এ, বি, সি, ডি” ইত্যাদি এই ভিটামিন গুলো আমাদের ত্বক, চুল, মুখ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পুষ্টি যোগায়।
  • ডাটা শাকের ক্যালোরি কম থাকে এবং ফাইবার বেশি থাকে যা চর্বিযুক্ত শরীর বা ভুঁড়ি কমাতে সাহায্য করে।
  • ডাটা শাকের পাতাগুলো দ্রবণীয় এবং ফাইবার সমৃদ্ধ যা হূদরোগ কমিয়ে দিতে সাহায্য করে কারণ এগুলো রক্তে কোলেস্টেরল কমায়।
  • ডাটা শাকের রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন যা লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। যার ফলে শরীরে রক্তশূন্যতা দূর হবে।

ডাটা শাক রান্নার রেসিপি

ডাটা শাক রান্না করার জন্য প্রথমে ডাটা পাতা এবং পাতার সাথে থাকা নরম ডগা বেছে নিতে হবে। তারপর ভালোভাবে ধুয়ে কুচি কুচি করে কেটে নিতে হবে। ডাটা শাক রান্না করার জন্য আপনার লাগবে পেঁয়াজ, রসুন, তেল, লবন শুকনো মরিচ এবং কাঁচা মরিচ।

একটি কড়াইতে ডাটা শাক নিয়ে লবণ দিয়ে মেখে কিছুক্ষণ রেখে দিয়ে ভালোভাবে সেদ্ধ করে নিন। তারপর কড়াইয়ে তেল দিয়ে, সেই তেলে পেঁয়াজ কুচি, রসুন কুচি, শুকনো মরিচের কুচি দিয়ে কিছুক্ষণ নেড়ে চেড়ে নিনি। অর্থাৎ শাক বাগার দেওয়ার উপকরণ তৈরি করে নিন।

তারপর শাক সেই কড়াইয়ে ঢেলে দিন। তারপর কাঁচামরিচ দিয়ে দিন। এরপর ভালোভাবে চামাচ বা খুনতি দিয়ে নাড়াচাড়া দিয়ে মাখিয়ে নিন। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর হয়ে গেল আপনার মজাদার ডাটা শাক।

Share your love
Hemal Hasan
Hemal Hasan
Articles: 28