অনলাইন গেমে আসক্তি প্রতিভা বিকাশে বাধার সমাধান

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বেশিরভাগ গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। ধরুন যদি কেউ বলে আপনাকে এখন থেকে মোবাইল এবং ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকতে হবে। আপনি কি পারবেন? আমার মনে হয় আপনি পারবেন না।

কারণ আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে আপনাকে ইন্টারনেট কিংবা স্মার্টফোনকে বাদ দেওয়ার কোনো উপায় নাই। কিন্তু বলা বাহুল্য বর্তমানের তরুণ প্রজন্মকে স্মার্টফোন কতটা সুফল এনে দিচ্ছে তা নিয়ে একটু ভাবার সময় এসেছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে স্মার্টফোনের অনলাইন ভিত্তিক গেমগুলো মাদকের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

এসকল গেমস এত বড় নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এগুলো থেকে বের হওয়াটা খুবই কঠিন। আসক্ত মানুষ বিভিন্ন জিনিসের উপর হতে পারে শুধু যে মানুষ মাদকাসক্ত হয় এরকম না বর্তমানে অনেক মানুষ গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের যেমন মাদকদ্রব্য সেবন করতে না পারলে কোন কিছু ভালো লাগে না তেমনি গেম আশক্তি ব্যক্তিরাও গেম খেলতে না পারলে তাদের ভালো লাগে না কিংবা ছটফট করতে থাকে।

তরুণ প্রজন্মের আসক্তি গেমগুলো

বর্তমানে কম্পিউটার ও মোবাইলের অনেক ধরনের গ্রীন রয়েছে যেগুলোর প্রতি তরুণসমাজ সবথেকে বেশি আসক্ত। দিন নেই রাত নেই সারাদিন সেই গেম গুলো নিয়ে পড়ে থাকে। তরুণ প্রজন্ম বর্তমানে বেশিরভাগ অনলাইন গেমের প্রতি আসক্ত। বর্তমানে অনেক মাল্টিপ্লেয়ার অনলাইন গেম বের হয়েছে।

তরুণ প্রজন্মের সবথেকে বেশি আসক্তি গেমমগুলো হচ্ছেঃ ফ্রি ফায়ার, পাবজি, ক্লাস অহ ক্লানস, ফোর্ট নাইট, মাইনক্রাফট, মোবাইল লিজেন্ডস ইত্যাদি সহ আরও গেম রয়েছে যেগুলোর প্রতি বর্তমানে তরুন সমাজ আসক্ত। তবে ৮০ শতাংশ মানুষ সবথেকে বেশি পাবজি ও ফ্রী ফায়ার এর প্রতি আসক্ত।

তরুণ প্রজন্ম গেমে আসক্তি প্রতিভা বিকাশে বাধার কারন

অনেকেই মনে করতে পারেন যে গেমের সাথে আবার মেধা বিকাশের কি সম্পর্ক? তাহলে একটু চিন্তা করুন সে যে সময়টা গেম খেলে কাটাচ্ছে সেটা যদি অন্য কাজে ব্যয় করত তাহলে সে কাজে তার কিছুটা হলেও প্রতিভাবিকাশ হতো।

প্রতিভা বলতে বোঝানো হয়েছে কোন কাজের দক্ষ বা দক্ষতা অর্জন। অর্থাৎ যদি তারা গেম না খেলে মোবাইল বা কম্পিউটারে কিছু শেখার চেষ্টা করত যেমন গ্রাফিক্স ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ওয়েব ডেভলপার, অ্যাপ ডেভেলপার ইত্যাদি সহ নানা রকম বর্তমানে  শেখার জিনিস রয়েছে কম্পিউটারে। হঠাৎ যেগুলো শিক্ষার ফলে তার প্রতিভা বিকাশ পতো।

কিন্তু বর্তমানে তারা সারাক্ষন গেম খেলতে থাকে যার ফলে প্রতিভা বিকাশ তো দূরে থাক পড়ালেখায় মনোযোগী হয়ে ওঠে না। তাদের মধ্যে কি ধরনের প্রতিভা রয়েছে তারা সে সম্পর্কে বুঝতে পারেনা কারণ তারা শুধু মনে পড়ে গেম খেলতে পারলেই তাদের জীবন সার্থক।

তবে আবার অনেক মানুষ রয়েছে যারা গেম খেলে টাকা উপার্জন করেছে। তাদের কথা ভিন্ন কারণ কেউ গেম খেলে ভিডিও তৈরি করছে আবার কেউ গেমকে প্রফেশনালি ভাবে নিয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু কিছু মানুষ রয়েছে যারা সারাদিন শুধু গেম খেলে চোখ নষ্ট করে, যেখানে তাদের কোন লাভ হয় না বরং তারা তাদের সময় নষ্ট করছে।

সহিংস মনোভাবি করে তুলছে তরুন প্রজন্মকে

 যখন সে গেম খেলার মধ্যে থাকবে তখন যদি কোন হুকুম করেন বা কোন একটি কাজের কথা বলেন তাহলে দেখবেন হিংস্র প্রাণীর মতো আচরণ করে। এমনও অনেক জায়গায় খবরে পাওয়া গেছে গেম নিয়ে ঝগড়া করে দুই বন্ধুর মধ্যে খুনাখুনি কিংবা এমবি কেনার টাকা না দেওয়ায় বাবা-মাকে খুন।

বর্তমানে গেম নিয়ে এমন অহরহ অনেক খবর শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ এই সারাদিন গেম খেলার ফলে তাদের মনের মধ্যে সহিংস মনোভাব গড়ে উঠছে যা সামনে দিনে আরো ভয়ঙ্কর হতে পারে।

তরুণ প্রজন্ম গেম আসক্তির কারণ

তরুণ প্রজন্ম গেমে প্রতি আসক্তির পেছনে অনেক কারন রয়েছে। সবথেকে বেশি তরুণ সমাজকে মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে চলাকালীন সময়ে।

কারণ করোনাকালীন সময়ে প্রায় এক বছরের উপর মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেনি, স্কুল-কলেজ সকল কিছু বন্ধ ছিল। যার ফলে সময় কাটানোর জন্য কিংবা সময় পার করার জন্য তারা নতুন নতুন গেম খেলতো, আর এতে করে আস্তে আস্তে তাদের পড়ালেখা থেকে মনোযোগ উঠে যায় এবং গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে।

তাছাড়া বর্তমানে অভিভাবকরা ছোট বাচ্চাদের হাতে মোবাইল ফোন দিয়ে দেয় যার ফলে অন্যান্য মানুষদের দেখে তার মধ্যে গেম খেলার আগ্রহ জন্মায় এবং গেমগুলো ফ্রী হওয়াতে সে সেই গেমগুলো ডাউনলোড করে খেলতে থাকে।

অনেক মা-বাবা চাকরি করে বিদায় সারাদিন বাড়িতে থাকে না, এতে করে তার বাচ্চা সারাদিন কি করছে সেই খোঁজখবর নিতে পারে না। যখন সে বাড়িতে একা থাকে তখন সারাদিন গেম খেলার ফলে গেমের প্রতি অনেকে আসক্ত হয়ে পড়ে।

আর গেম কোম্পানিগুলো বর্তমানে এমন ভাবে তাদের গেম কি করে যেন মানুষ তাদের গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে মানুষ সারাদিন তাদের গেম খেলবে।

তারা সময়ের সাথে সাথে তাদের বিভিন্ন টেকনিক অবলম্বন করে নতুন নতুন জিনিস নিয়ে আসে গেমের মধ্যে মনোযোগ আকৃষ্ট করার। অনেকে বন্ধুদের কারনেও গেমের প্রতি আরো বেশি করে আকৃষ্ট হচ্ছে, কারণ তারা একজনের কাছ থেকে আরেকজন গেমের আইডি এগিয়ে থাকার জন্য সারাদিন গেম খেলছে।

যার ফলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগেই আছে এবং এর ফলে তারা সারাদিন গেমের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।

গেমের প্রতি আসক্তির লক্ষণ

অনেক মানুষ রয়েছে যারা মাঝেমধ্যে একটু সময় পার করার জন্য গেম খেলে থাকে, তার মানে এই নয় যে তারা সেই গেমের প্রতি আসক্ত। তবে আসলেই অনেক মানুষ রয়েছে যারা গেমের প্রতি প্রচন্ড পরিমানে আসক্ত। আর গেমের প্রতি আসক্তির লক্ষণ গুলো হচ্ছেঃ

  • কোন কিছু বললে হিংস্র প্রাণীর মতো আচরণ করে।
  • একা একা সারা দিন রুমের মধ্যে বসে বসে গেম খেলে।
  • রাতের বেশীর ভাগ সময় গেমের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে।
  • খাওয়ার মধ্যেও গেম খেলতে থাকে।
  • কোন কারনে গেম খেলতে না পারলে অসহনীয় মনে হয়।
  • তার চিন্তাভাবনা গুলো শুধুই গেমের চারপাশ ঘিরে।

গেম আসক্তি থেকে প্রতিকার 

তরুণ প্রজন্মকে গেমের প্রতি আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বপ্রথম দায়িত্ব হচ্ছে অভিভাবকের। আর কখনো তাদের সরাসরি গেম আসক্তি থেকে ফিরে আনা যাবে না বরং এরকম চেষ্টা করলে আরও ভয়ংকর ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে তাতে মনে হিংসাত্মক মনোভাব তৈরি হতে পারে।

তাই প্রথমে তাদেরকে বুঝাতে হবে। তাদেরকে বিভিন্ন কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখতে হবে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতা মূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহ দিতে হবে।

যদি দেখেন গেমের প্রতি আসক্তি প্রচন্ড পর্যায়ে এবং তার আচরণে দিন দিন পরিবর্তন হচ্ছে অর্থাৎ খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে তাহলে যত দ্রুত সম্ভব মানসিক ডাক্তারের সাথে আলোচনা করতে পারেন। কারণ যদি এটি আরও গুরুতর অবস্থায় যেতে থাকে তাহলে তাকে পরবর্তীতে গেম আসক্তি থেকে ফেরানো কষ্টসাধ্য হবে।

আসক্তি থেকে বাচঁতে আপনি নিজে কি করতে পারেন

আপনি নিজে যদি গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে থাকেন তাহলে আপনার এখনই সেই আসক্তি দূর করা উচিত। গেমের প্রতি সময় নষ্ট না করে আপনি সেই সময়কে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারে।

আপনার মত অনেকেই গেম খেলে টাকা উপার্জন করছে আর আপনি শুধু শুধু গেম খেলে সময় নষ্ট করছেন। তাই গেম নিয়েও অনেক কিছু করা যায় সেই সম্পর্কে শিখুন এবং কিছু করার চেষ্টা করুন।

আর তাছাড়া গেম আসক্তি দূর করার জন্য আপনি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুললে আপনার নতুন নতুন বই পড়ার আগ্রহ জন্মাবে এবং নতুন কিছু জানার ইচ্ছে হবে। ঘরের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন রকম আউটডোর খেলাগুলো খেলার চেষ্টা করুন।

আপনি যতক্ষন খেলার মধ্যে ততক্ষণ গেমের কথা মনে পরবে না। তাই গেম আসক্তি থেকে দূরে থাকার জন্য আপনি নতুন নতুন কিছু চেষ্টা করতে পারেন বা বিভিন্ন জন্য কিছু শেখার চেষ্টা করতে পারেন। এতে আপনার মনোযোগ গেম থেকে দূরে থাকবে।

Share your love
Salman Shemul☑️
Salman Shemul☑️
Articles: 20