ফ্রিল্যান্সিং করে সফল হওয়ার ১০ মন্ত্র

বর্তমান সময়ে ফ্রিল্যান্সিং একটি জনপ্রিয় পেশা। অনেকেই চাকরি করার থেকে  ফ্রিল্যান্সিংকে বেশি পছন্দ করেন। ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য চাই একটি কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ, যেকোনো একটি বিষয়ে দক্ষতা(গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং, ফটো এন্ড ভিডিও এডিটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি), ইংরেজি পড়ে বোঝা এবং লেখার দক্ষতা।

অনেকে ফ্রিল্যান্সিংকে পার্ট টাইম পেশা অথবা শখের বশে শুরু করলেও পরবর্তীতে এটাকে ফুল টাইম পেশা হিসেবে বেছে নেয়। আর আপনি যখন এটাকে আপনার পেশা হিসেবে বেছে নিবেন অবশ্যই আপনার কিছু জিনিস দরকার হবে। আপনার ফ্রিল্যান্সিং পেশাটাকে কিভাবে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং ঝুঁকিমুক্ত জীবন যাপন করবেন এসব বিষয় সম্পর্কে জানা জরুরী। অনেকেই প্রথম থেকে সফলতা পায় এবং পরবর্তীতে ব্যর্থতার গ্লানি দিয়ে জীবন আচ্ছাদিত করে ফেলে। আবার অনেকেই প্রথমদিকে সফল হতে পারেনা বলে সব আশা ছেড়ে দেয়।

আর ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হলো ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য আপনার মধ্যে যে বিষয়গুলো থাকা দরকার সেগুলো না জানা। আবার জেনে থাকলেও তা নিজের মধ্যে বাস্তবায়ন করেনি। সফল ফ্রিল্যান্সার হওয়ার জন্য আপনার মধ্যে যে জিনিস গুলো থাকা দরকার তা নিয়ে এই আর্টিকেলে আলোচনা করবো।

ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য যে ১০টি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ

পরিকল্পনা, আইডিয়া, মূল্য নির্ধারণ, সঞ্চয়, ক্লায়েন্ট ধরে রাখা, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায়, পোর্টফলিও, রিসার্চ, সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা।

পরিকল্পনা

শুধু ফ্রিল্যান্সিং নয় যেকোনো কাজে সফল হওয়ার অন্যতম মন্ত্র হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা। ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য আপনাকে সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। যেমন আপনার মধ্যে কোন ধরনের স্কিল বা দক্ষতা আছে এবং আপনি কোন ধরনের মার্কেটপ্লেসে কাজ করতে চান তা ঠিক করতে হবে।

ভাষাগত দক্ষতা বা ক্লায়েন্ট এর সাথে কমিউনিকেশন স্কিল কেমন আছে? যদি ভাষাগত দক্ষতা আপনার মধ্যে থাকে তাহলে তো ভালোই আর না হলে আপনাকে ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা। একটি ভালো কম্পিউটার এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ নিতে হবে।

আইডিয়া

আপনি কোন বিষয়ের উপর ফ্রিল্যান্সিং করতে চান যদি সে বিষয়ে আপনার কোন আইডিয়াই না থাকে তাহলে ফ্রিল্যান্সিং করার কোন মানে নেই। যেমনঃ আপনি বিরিয়ানি রান্না করবেন কিন্তু পোলাও এবং মাংস কি তাই জানেন না। একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হওয়ার জন্য আপনার স্কিল এবং কাজ করার মার্কেটপ্লেস সম্পর্কে সম্পূর্ণ আইডিয়া বা ধারণা থাকতে হবে।

যেমনঃ আপনি কনটেন্ট রাইটার হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং করতে চান তাহলে অবশ্যই আপনাকে এ বিষয়ে আইডিয়া থাকতে হবে। অবশ্যই ধারণা থাকতে হবে কোন ওয়েব সাইটে কনটেন্ট রাইটার হিসেবে কাজ পাওয়া সম্ভব। এরকম আপনি যে সেক্টর নিয়েই ফ্রিল্যান্সিং করতে চান অবশ্যই সে সেক্টরে সম্পর্কে আপনার মধ্যে পর্যাপ্ত আইডিয়া থাকতে হবে। আর কোন বিষয় সম্পর্কে আইডিয়া বা ধারণা বা জ্ঞান অর্জন করার উপায় হচ্ছে সেই বিষয় নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘাটাঘাটি করা বা রিসার্চ করা, নোট করা, বিষয় গুলো বারবার দেখা ইত্যাদি।

মূল্য বা দাম নির্ধারণ

ফ্রিল্যান্সিং এর অন্যতম একটি ধাপ হচ্ছে মূল্য বা দাম নির্ধারণ। আপনি যে বিষয় নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করেন না কেন তার সঠিক মূল্য নির্ধারণ করতে না পারলে আপনি কাজ পাবেন না। যেমন ঘন্টা ভিত্তিক জবে সঠিক দাম না দিলে ক্লায়েন্ট হারাবেন। তাছাড়া বিড করার সময় যদি সঠিক রেট না দেন তাহলে কাজ না পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

আবার আপনি যদি ইনভাটো টাইপের মার্কেটপ্লেসে কাজ করেন, আর আপনি যদি পণ্যের সঠিক দাম নির্ধারণ করতে না পারেন তাহলে আপনার পণ্যই বিক্রি হবে না। সুতরাং বুঝতেই পারছেন কাজের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে অনেক ভেবে চিন্তে এবং সঠিকভাবে। আর আপনি যদি একদম নতুন হয়ে থাকেন তাহলে ফ্রিল্যান্সারদের মার্কেটপ্লেস যেমন আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার, ফাইভার, পিপল পার আওয়ার ইত্যাদি সাইটে প্রবেশ করে থাকেন তবে আপনার কাজের ঘন্টা রেট দিতে পারেন সাধারণ মূল্যে(৫ থেকে ১০ ডলার)।

বিগিনার হিসেবে যদি আপনি এর থেকে বেশি রেট নির্ধারণ করেন তাহলে আপনাকে দিয়ে কেউ কাজ করাতে চাইবে না। আবার আপনি যদি এক্সপার্ট হয়ে থাকেন তাহলে তাহলে অবশ্যই আপনি একটু বেশি রেট নির্ধারণ করতে পারবেন। তা না হলে আপনার আয় কম হবে।

সঞ্চয়

ফ্রিল্যান্সিং একটি মুক্ত পেশা। আপনাকে এখানে সঞ্চয় করতে হবে কারণ সামনে আপনি কাজ পাবেন কিনা তার কোন গ্যারান্টি নেই। আপনি টাকা আয় করার সাথে সাথে যদি সব টাকা খরচ করে ফেলেন তাহলে ভবিষ্যতে আপনাকে পস্তাতে হতে পারে। তাই আপনাকে বুঝেশুনে ব্যয় করতে হবে এবং নির্দিষ্ট একটা অংশ সঞ্চয় বা জমা করে রাখতে হবে।

ক্লায়েন্ট বা কাস্টমার ধরে রাখা

যারা ক্লায়েন্ট ভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং করেন তাদের জন্য ক্লায়েন্ট সবকিছু। কারণ ক্লায়েন্ট মানে কাজ আর কাজ মানে টাকা। তাই প্রত্যেক ক্লায়েন্ট ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ক্লায়েন্টের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে এবং সবসময় তাদের কাজগুলো সেরাটা দিয়ে করতে হবে। ক্লায়েন্ট ধরে রাখার জন্য আপনি যা করতে পারেন- ক্লায়েন্টের চাহিদা কে গুরুত্ব দেওয়া, কাজের মধ্যে স্বচ্ছতা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, অতিরিক্ত সেবা দেয়ার চেষ্টা করা।

শৃঙ্খলা বজায় রাখা

যেহেতু ফ্রিল্যান্সিং একটি স্বাধীন পেশা তাই অনেকেই এ পেশায় আসলে ছন্নছাড়া বা শৃঙ্খলা বিহীন জীবন যাপন করে। আর এটা অবশ্যই খারাপ অভ্যাস। ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য শৃঙ্খলা খুব জরুরী। যার ফলে আপনি ক্লায়েন্ট ধরে রাখতে পারবেন এবং আপনার ব্যক্তিগত জীবনকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখতে পারবেন। টাইম টেবিল মেনে খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, গোসল ইত্যাদি করতে হবে।

ফ্রিল্যান্সিং পেশায় ক্লায়েন্ট বাইরের দেশে থাকে তাই বেশিরভাগ কাজের অর্ডার আসে রাতে। তাই রাতে সজাগ থাকার জন্য দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে হবে। স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য ঘুম অন্যতম একটি দরকারি জিনিস তাই অবশ্যই এর গুরুত্ব দিতে হবে। আর আপনি যদি সুস্থ না থাকেন তাহলে আপনি কাজ করতে পারবেন না।

অধ্যবসায়

অধ্যবসায় ছাড়া ফ্রিল্যান্সিং করা অসম্ভব। আপনি পৃথিবীর সকল সফল ফ্রিল্যান্সারদের সফলতার কথা জিজ্ঞেস করলে প্রথমে তারা অধ্যবসায়ের কথা বলবে। ক্লায়েন্ট না পাওয়া অথবা বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরেও তারা হাল ছাড়েনি চেষ্টা করে গিয়েছেন। সুতরাং ফ্রিল্যান্সিং করতে হলে অবশ্যই আপনার অধ্যবসায় এবং ধৈর্য থাকতে হবে। প্রথমবারের চেষ্টায় আপনি সফল হতে পারেন আবার নাও হতে পারেন তাই হাল ছাড়লে চলবে না, আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং অধ্যবসায় করতে হবে।

পোর্টফোলিও

পোর্টফোলিও হচ্ছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দোকান বা প্রফাইল যেখানে শিল্পকর্ম বা কাজের নমুনা সংরক্ষণ করা হয়। সহজভাবে বললে পোর্টফোলিও হচ্ছে ফ্রিল্যান্সার যে বিষয় নিয়ে কাজ করে সে বিষয়ে কাজের কিছু নমুনা অনলাইন প্লাটফর্ম সংরক্ষণ করা। আপনি যদি নতুন ফ্রিল্যান্সার বা বিগেনার হয়ে থাকেন অবশ্যই পোর্টফোলিও থাকতে হবে।

পোর্টফোলিও দেখেই নতুন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে তারা আপনাকে যাচাই করবে। আপনার মুখের কথায় তারা বিশ্বাস করবে না আপনি কতটুকু অভিজ্ঞ। তাই ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে চাইলে নিজের কাজের একটি পোর্টফোলিও তৈরি করুন।

রিসার্চ বা গবেষণা

রিসার্চ বা গবেষণা বলতে বোঝানো হয়েছে নিজেকে আপডেট বা উন্নত করে রাখা। যেমন বর্তমানে মার্কেটে কিসের চাহিদা বেশি বা কিসের চাহিদা কম সে সম্পর্কে অবগত থাকা। নিজের দুর্বলতা গুলো খুজে বের করা এবং নিজের স্ট্রং পয়েন্ট গুলো বোঝার চেষ্টা করা । সব সময় নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করা। কি কি কাজ করলে নিজেকে একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় সেগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করা।

সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা

যেকোনো কাজেই একদল লোক আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করবেই। সেই সমালোচনার জবাব মুখে না দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করার মাধ্যমে কাজের মধ্য দিয়ে করে দেখাতে হবে। মানুষ সমালোচনা করবেই সমালোচনাগুলো কে পজেটিভ হিসেবে নিয়ে নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করুন।

উপরে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো সেগুলোকে যদি নিজের জীবনে প্রতিফলন ঘটাতে পারেন তাহলে ইনশাআল্লাহ অবশ্যই একদিন না একদিন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। মনে রাখবেন একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হতে চাইলে এগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

এরকম বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল বা পোস্ট পেতে চাইলে আমাদের সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ।

বিডিপপুলারে আপনাকে স্বাগতম!

আপনার লেখা বিডিপপুলারে পাবলিশ করবেন কিভাবে?

Leave a Comment