ডায়াবেটিস কেন হয়

ডায়াবেটিস কেন হয়

পুরো পৃথিবীতে ডায়াবেটিস একটি পরিচিত রোগের নাম। বাংলাদেশ এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। এই পোষ্টে ডায়াবেটিস নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো।

ডায়াবেটিস কি

ডায়াবেটিস এক ধরনের বিপাকীয় রোগ বা মেটাবলিক ডিসঅর্ডার। যে রোগ আমাদের শরীরের রক্তে গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাতকরণের স্বাভাবিক শারীরিক সামর্থ্যকে কমিয়ে ফেলে বা বাধাগ্রস্ত করে তাকে ডায়াবেটিস বলে।

রক্তে উপস্থিত গ্লুকোজ ইনসুলিন এর সাহায্যে কোষের গেলে সেখান থেকে বিপাক প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয়। আর এই শক্তি শরীরের সমস্ত কোষে সরবরাহ হয়। ডায়াবেটিসের ফলে যেহেতু শরীরে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে না সেজন্য গ্লুকোজ এই অব্যবহৃত হিসেবে থেকে যাওয়ার কারণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিস কেন হয়

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আপনাকে কিছু বিষয় জেনে নিতে হবে।

রক্তে কিভাবে গ্লুকোজ পৌঁছায়

শর্করা জাতীয় খাদ্য হচ্ছে গ্লুকোজের উৎস। আমরা যখন ভাত রুটি চিড়া-মুড়ি ইত্যাদি সরকার জাতীয় খাবার খাই। এই খাবারগুলো খাওয়ার পর পাকস্থলীতে হজম প্রক্রিয়া শেষে এর সারাংশ অর্থাৎ গ্লুকোজ স্মল ইন্টেসটাইন বা ক্ষুদ্রান্তের প্রাচীর থেকে শোষিত হয়ে রক্তে পৌঁছায়। আর এভাবে প্রতিনিয়ত রক্তে গ্লুকোজ আসতে থাকে।

গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাতকরণের স্বাভাবিক শারীরিক সামর্থ্য

রক্তে গ্লুকোজ পৌঁছানোর পর থেকেই ইনসুলিনের ভূমিকা শুরু হয়ে যায়। ইনসুলিন হলো একটি হরমোন যা প্যানক্রিয়াসের এক প্রকার কোষ থেকে নিঃসৃত হয় রক্ত প্রবাহের সাথে মিশে যায়। আর রক্তস্রোতে প্রবাহিত হওয়ার মাধ্যমে ইনসুলিন রক্তে বিদ্যমান গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।

এভাবেই ইনসুলিন রক্তের গ্লুকোজকে কোষে পাঠিয়ে দিয়ে রক্তে গ্লুকোজের উপস্থিতি স্বাভাবিক রাখে।

গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাতকরণের স্বাভাবিক শারীরিক সামর্থ্য হচ্ছে রক্তে গ্লুকোজের উপস্থিতি অনুযায়ী পেনক্রিয়াস কর্তৃক প্রয়োজনমত ইনসুলিন সরবরাহ করা।

গ্লুকোজ কিভাবে শরীরের ব্যবহৃত হয়

আমরা এতক্ষণ জানলাম যে ইনসুলিন এর মাধ্যমে রক্ত থেকে গ্লুকোজ শরীরে কোষসমূহে পৌঁছায়। গ্লুকোজ কোষে পৌঁছানোর পর একাধিক বায়োকেমিক্যাল ধাপ অনুসরণের মাধ্যমে বিপাকীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গ্লুকোজ থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়। যে শক্তি পাওয়ার মাধ্যমে আমরা বাস্তব জীবনের যাবতীয় কাজকর্ম করে থাকি।

এই ইনসুলিন হরমোনটি উৎপন্ন হয় শরীরের অভ্যন্তরে পেনক্রিয়াসের বিটা সেল থেকে। যদি কোন কারনে প্যানক্রিয়াস তা স্বাভাবিক কর্ম ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তাহলে তা প্রয়োজনীয় পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি করতে ব্যর্থ হবে তখন রক্তে উপস্থিত গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাত হতে পারবে না।

ফলশ্রুতিতে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাবে। একইসাথে রক্তে গ্লুকোজ ব্যবহৃত না হওয়ায় শরীরের কোষগুলো স্বাভাবিক শক্তি লাভ করার থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে শরীরের দুর্বলতা দেখা দেয়।

উপরের পুরো আলোচনা সারমর্ম হলো আমরা যখন খাবার খাই তখন আমাদের প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন নিঃসৃত হয়। ইনসুলিনের কাজ হলো যে সকল খাবার খাচ্ছি তার অতিরিক্ত গ্লুকোজ কমিয়ে দেওয়া। আর ইনসুলিনের উৎপাদন কমে গেলে বা উৎপাদন হওয়ার পরও যখন ইনসুলিন কাজ করতে পারে না তখন শরীরের অতিরিক্ত গ্লুকোজ থেকে যায়। আরে অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলা হয়। 

কয় ধরনের ডায়াবেটিস রয়েছে

কয়েক প্রকারের ডায়াবেটিস হতে পারে। যথাঃ

টাইপ ১,

টাইপ ২,

প্রি ডায়াবেটিস এবং

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস ইত্যাদি। 

ডায়াবেটিস কত হলে বিপদ

ডায়াবেটিস শনাক্ত করার জন্য সবচেয়ে সঠিক এবং বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)। এ পদ্ধতিতে রগোকে খালি পেটে একবার রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করতে হয়। এরপর ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ শরবত পানের দুই ঘন্টা পর আবার গ্লুকোজ পরীক্ষা করা হয়।

উপরে বর্ণিত পরীক্ষা করতে প্রায় ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়। কারণ কমপক্ষে 8 ঘণ্টা না খেয়ে সকালে রক্তের নমুনা ২বার দিতে হয়। মাঝখানে কমপক্ষে  ২ ঘন্টা যাবৎ বিশ্রাম বা ল্যাবে বসে থাকতে হয়।

ডায়াবেটিক শনাক্তকরণের জন্য এর থেকে সহজ পদ্ধতি হলো এইচবিএ১সি নামের পরীক্ষা করা হয়। এ পরীক্ষায় সুবিধা হলো এটি যে কোন সময় করা যায় এবং রক্তের নমুনা একবার দিলেই হয়। 

এইচবিএ১সি এর মান ৫.৭  এর নিচে হলে তাকে স্বাভাবিক বা নরমাল ধরা হয়। আর ৬.৫  এর বেশি হলে ডায়াবেটিস আছে বলে ধরা হয়। ৫.৭-৬.৫ এর মাঝখানে থাকলে প্রি ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিস এর পূর্বাবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

ডায়াবেটিস পরীক্ষা করার জন্য ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট বা এইচবিএ১সি এই দুটি পরীক্ষা করা যেতে পারে। 

ডায়াবেটিস রোগী যেসব খাবার খেতে পারবেন

মাছের তেল, কটলিভার বাদাম, উপকারী চর্বি ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

টাটকা সবুজ শাকসবজি এবং ফলমূল খেতে পারবে।

দেশি মুরগি এবং মাছ খেতে পারবেন।

প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমনঃ ডিম এবং টক দই ইত্যাদি খেতে পারবে।

ডায়াবেটিস রোগী যেসব খাবার কম খেতে হবে

যেসব খাবারে চিনি থাকে যেমন মিষ্টি, আইসক্রিম, ডেজার্ট জাতীয় খাবার ইত্যাদি খাওয়া যাবে না।

ফাস্টফুড জাতীয় খাবার কম খেতে হবে।

চিনিযুক্ত সেরিয়াল ও সাদা পাউরুটি বেশি খাওয়া যাবেনা।

প্যাকেটজাত মাছ ও মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত পাস্তা বা চাল তোরা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

ডায়াবেটিস হলে যে সকল সমস্যা দেখা দিবে

রক্তে চিনির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে রক্তনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে

শরীরের সকল অঙ্গে সঠিকভাবে রক্ত প্রবাহ না হলে স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

আক্রান্ত ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক এবং কিডনি সমস্যা সহ আরো জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

ডায়াবেটিস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়ায় খুব সহজে শরীর নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। 

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আমাদের খাদ্য অভ্যাস হতে হবে নিয়ন্ত্রিত এবং পরিমিত। এছাড়া আমাদের শারীরিক ব্যায়াম বা পরিশ্রম করতে হবে। নিয়মিত ডায়াবেটিস এর মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। ডায়াবেটিসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে সাধারণ জীবন যাপন করতে পারবেন।

বিডিপপুলারে আপনাকে স্বাগতম!

আপনার লেখা বিডিপপুলারে পাবলিশ করবেন কিভাবে?